মা ~ আঠাশে নভেম্বর, ২০১৮
মা,
আজকে
একটা গান শুনতে শুনতে তোমার কথা হঠাৎ মনে এলো...
গোপন রহি গভীর প্রাণে আমার দুঃখসুখের গানে
সুর দিয়েছ তুমি, আমি তোমার গান তো গাইনি ...
গোপন রহি গভীর প্রাণে আমার দুঃখসুখের গানে
সুর দিয়েছ তুমি, আমি তোমার গান তো গাইনি ...
এই
চিঠিটা তোমার জন্মদিনের দিন লিখতে শুরু করেছিলাম জানো, হাজার
কাজের ফাঁকে বাদ পড়ে গেছে যথারীতি, রোজকার
কাজের তালিকায় প্রথম নম্বরে থেকেও শেষমেশ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে । বয়স হলে
অসম্পূর্ণতায় ভয় করে । তোমার বয়স ; আমারও । বলার কথা কত, বিয়াল্লিশ বছর ধরে একটু একটু করে বড় হওয়ার গল্প আমার ; তোমারও ।
এক
ছুটে অরিগামি দেখাতে গিয়ে পর্দার ওপার থেকে ফুটন্ত জলে পুড়ে যাওয়া ... মনে ভাবি
তুমি ভয়ে চিন্তায় পাগল হয়ে গিয়েও কীভাবে আশ্চর্য এক বিশ্বাসের জোরে আমাকে পুরোপুরি
সুস্থ করে তুলেছিলে । না জানি কত কথা শুনতে হয়ে থাকবে সেই মাকে ভাগ্যের ফেরে যার
হাতে মেয়ের ক্ষতি হয়েছিল,
নিজের কোন দোষ না থাকা সত্ত্বেও । যেদিন ক্লাস থ্রি তে ফার্স্ট
হলাম, যেদিন মাধ্যমিক এর রেসাল্ট নিয়ে এলাম, যেদিন ইউনিভার্সিটি তে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলাম – সেইগুলো আমার না তোমার সাফল্য বোঝাই কঠিন ছিল । এখনও বোধহয় নার্সারি
থেকে টুয়েলভ অবধি আমার সমস্ত রিপোর্ট কার্ড ফাইল এ গুছিয়ে রেখেছ । বড় হয়ে ওঠার পথে
আমার পোষা ছিল এক ঝুড়ি মনখারাপ – কোন কথা শুনতে না চেয়ে,
কোন কথা না বলেও তুমি কেমন মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, তোমার আঁচলের – গায়ের চন্দনের মত গন্ধ মনে পড়ে,
আর ঠিক ওই মুহূর্তের কান্নাতে যেমনটা মন আলতো আরাম পেত সেই আরাম মনে পড়ে ; তেমনটা আর কিছুতে হত না – সবচেয়ে প্রিয় কবিতার
বই পড়েও না । গ্র্যাজুয়েশান এর পার্ট ওয়ান এর পেপার খারাপ হয়ে যেদিন বন্ধুদের
দেখাদেখি বললাম এবছর ড্রপ দেব, আর বাবা বলল, আর যাই কর পালিয়ে যাওয়া এলাউড না, সেদিন মাথায়
হাত দিয়ে তুমি বলেছিলে – পরীক্ষা দে, বিশ্বাস রাখ, সব ঠিক হবে ...। তারপর সেই যে
সেই এক মাস, ২০০১ ডিসেম্বর, একটা চাকরি
ছেড়ে দিয়ে আরেকটা চাকরি অনিশ্চিত হয়ে গিয়ে বাড়িতে বসে কাঁদতাম, তুমি রোজ বলতে - বিশ্বাস রাখ, আমি বলছি,
ধৈর্য ধর, সব ঠিক হবে । তোমার সেই
বিশ্বাসের ম্যাজিকে সত্যিই সব ঠিক হয়েছিল মা, আজ পর্যন্ত
হয়ে যাচ্ছে কত অসম্ভব সম্ভব - স্রেফ তোমারি বিশ্বাসে !
আমার
সিদ্ধান্তে চোখের রেটিনার অপারেশন করিয়ে যেদিন ৫ ঘণ্টার শেষে তুমি অসহায়, একটা
চোখে কিচ্ছুটি দেখতে পারছনা, সেইদিন তোমার মন্দির এ
গিয়েছিলাম তোমারই সেই বিশ্বাসের ভরসায় । ঈশ্বর আমায় ফেরান নি । আরও একবার,
সম্প্রতি, যখন তিন সপ্তাহের জ্বরে তুমি
অচেতন–প্রায়, সেই একই বিশ্বাসের
ভরে অনভ্যাসের প্রার্থনা, একটা ফুল, একটু
চোখের জলে ফিরে পাওয়া সেই মা কে, যাকে ছাড়া বাবার,
মেয়ের নিঃসন্দেহে অসুবিধা, কিন্তু
নাতনীদের জীবনযাপন একেবারে অসম্ভব ।
২০০৭
এ “মা” থেকে তুমি পারমানেন্টলি “দিদুন” হয়ে গেলে । ছোট্ট দুটো মানুষ হল মুখ্য,
আমি গৌণ । বাবা মৌন ।
সকাল
থেকে রাত,
রাত থেকে সকাল, অক্লান্ত যত্ন, অপত্য স্নেহ – প্লেস্কুল থেকে ক্লাস সিক্স,
লন্ডন থেকে কোলকাতা, নাচ থেকে গীটার,
সেরেল্যাক থেকে ইনহেলার – সব অনায়াসে
রপ্ত করেছ অদ্ভুত ভালবাসার টানে । জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা তোমাকে সামান্য ভালবাসা অথবা সাধারণ
সম্মানটুকু দিতে পারেনি সামাজিক সম্পর্কে, তাদের
ওপর একসময়ে একটা অসহায় রাগ হত ; কিন্তু জান মা, ইদানীং তাদের মুখগুলো ভারী আবছা লাগে আমার, কেমন
যেন অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় বৃহত্তর জীবনের বৃত্তে, বরং তোমার
নিঃশর্ত আর নিঃস্বার্থ ভালবাসা জ্বলজ্বল করে সেই আবছায়াতে । আমার দুটো মেয়ের মুখে
জ্বলজ্বল করে দিদুনের দেওয়া “ভাল মানুষ” তৈরি হওয়ার শিক্ষা । আশা রাখি চিরকাল করবে । কারন সারা পৃথিবীর যার কাছ
থেকে যাই শিখে থাকিনা কেন, নিজেকে ভুলে “নিজেদের”কে, এমনকি
সমস্ত দোষগুণের হিসেব ভুলে “অন্যদের”কেও - অন্তহীন ভালবাসা দিতে পারার শুভশিক্ষা আমি পেয়েছি শুধুমাত্র
তোমার কাছ থেকে ।
আমার
সমস্ত দুঃখসুখের গানে সুর দিয়ে গেছ এতটাই নিঃশব্দে, যে তোমার গান গাওয়ার
কথা কোনদিন মনেই আসেনি মা – প্রার্থনা করি, আমার হিয়া আর রিয়ার মাঝেই তোমায় যেন সবসময়, চিরদিন
খুঁজে পাই ।



